বিশেষ প্রতিনিধি, nipon।।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার)। নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে রাজধানী ঢাকা ছাড়ছেন কর্মজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটাররা। এরই মধ্যে শিল্পাঞ্চলের ছুটি শুরু হওয়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ আশপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার ( ১০ ফেব্রুয়ারি ) সকাল থেকেই সড়কগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বাস সংকটের সুযোগে কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে এবং অতিরিক্ত ভাড়া গুনে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ঘরমুখো যাত্রীরা।
এদিকে, ভোর থেকেই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। ট্রেন ধরতে আসা মানুষের চোখেমুখে ছিল আনন্দ ও প্রত্যাশার ছাপ। বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা আর হই-হুল্লোড় করে বাড়ি ফিরছেন তারা। অনেকের কাছে এই যাত্রা যেন ঈদে বাড়ি ফেরার মতো অনুভূতি তৈরি করেছে।
বাসের টিকিট না পাওয়ায় অধিকাংশ যাত্রী ট্রেন যাত্রা বেছে নিয়েছেন। তবে ট্রেনে আসন সংকট থাকায় অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে কিংবা ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠেই গন্তব্যে রওয়ানা হচ্ছেন। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
বাসযাত্রীরা জানান, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যেতে যেখানে সাধারণত ২০০ থেকে ২৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়, সেখানে এখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। বাস না পেয়ে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে ট্রাকে উঠছেন। ট্রাকে জনপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।
ময়মনসিংহগামী যাত্রী আকতার বলেন, সাধারণত ২৫০ টাকা ভাড়া লাগে। আজ সকালে বাসে উঠতে গিয়ে ৬০০ টাকা চাইল। বাধ্য হয়েই দিতে হয়েছে। এত ভোগান্তি আগের ঈদেও দেখিনি।’
একই অভিযোগ করে গার্মেন্টসকর্মী বুলবুলি বলেন,‘ভোটের জন্য ছুটি দিয়েছে, কিন্তু বাসই পাচ্ছি না। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছি। এখন মনে হচ্ছে ট্রাকে উঠতে হবে। সেখানেও ৪০০ টাকা নিচ্ছে।’
কমলাপুর স্টেশনে দেখা গেছে, কয়েকটি ট্রেন আসন পূর্ণ থাকার পরও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। অনেকে ভেতরে জায়গা না পেয়ে ট্রেনের ছাদে উঠছেন। এতে ঝুঁকি থাকলেও ভোটের টানে বাড়ি ফেরার আগ্রহই বেশি বলে জানান যাত্রীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন,‘আমরা যাত্রীদের ছাদে উঠতে নিষেধ করছি। কিন্তু অতিরিক্ত চাপের কারণে সবাইকে নামানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই ভোটের কথা বলে ঝুঁকি নিয়েই যাত্রা করছেন। মানবিক দিক বিবেচনায় আমাদেরও কিছুটা ছাড় দিতে হচ্ছে।’
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ভোট দিতে যাচ্ছেন আরিফা দম্পতি। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাদের একটি ফার্মেসি রয়েছে। আরিফা বলেন,‘দীর্ঘদিন পর এমন উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হচ্ছে। এবার প্রথমবার ভোট দেব। কমলাপুরে এসে দেখি আমার মতো শত শত মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে—ঈদের মতো লাগছে।’
কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া শহিদুল ইসলাম বলেন,‘এবারের নির্বাচন শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছি। তরুণ প্রজন্মের জন্য এটা বড় সুযোগ।’
রেলওয়ে সূত্র জানায়, নির্বাচন উপলক্ষে যাত্রীচাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। অতিরিক্ত কোচ সংযোজন ও বিশেষ ব্যবস্থার চেষ্টা করা হলেও ভিড় সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সরকার ১১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। নির্বাচন দিবস ১২ ফেব্রুয়ারি আগেই সাধারণ ছুটি হিসেবে নির্ধারিত ছিল। এছাড়া শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহ ও উৎসাহে রাজধানীর টার্মিনাল ও রেলস্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।