বিশেষ প্রতিনিধি, nipon।।
দুর্নীতির ধারণা সূচক (করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্স সিপিআই) ২০২৫-এ বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৪ পয়েন্ট অর্জন করে বিশ্বে নিচের দিক থেকে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। আগের বছরের তুলনায় স্কোর এক পয়েন্ট বাড়লেও অবস্থান এক ধাপ নেমে গেছে, যা দেশের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করছে।
মঙ্গলবার ( ১০ ফেব্রুয়ারি ) সকালে সূচক প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, সিপিআই ২০২৫ মূলত বাংলাদেশের জন্য একটি ‘হারানো সুযোগ’-এর প্রতিচ্ছবি। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের পতন আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হলেও, রাষ্ট্র সংস্কারে ধীরগতি, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির স্থায়িত্ব এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনের ঘাটতির কারণে সামগ্রিক মূল্যায়ন নেতিবাচক থেকে গেছে।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ সর্বনিম্ন। বৈশ্বিকভাবে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম, যা দেশটিকে ‘দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ হারানো দেশগুলোর’ সর্বনিম্ন কুইন্টাইলে ফেলেছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি দমনে দৃষ্টান্ত স্থাপনের ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ, দলবাজি ও দখলবাজির ধারাবাহিকতা এবং স্বচ্ছতার অভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
টিআইবির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের গড় সিপিআই স্কোর ছিল ২৬। অথচ ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ২৪-এ, যা গড়ের চেয়ে দুই পয়েন্ট কম এবং ২০১৭ সালে অর্জিত সর্বোচ্চ ২৮ স্কোরের তুলনায় চার পয়েন্ট কম। গত এক দশকে (২০১৬–২০২৫) বাংলাদেশ মোট দুই পয়েন্ট হারিয়েছে।
বৈশ্বিক গড় স্কোর যেখানে ৪২, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে ১৮ পয়েন্ট। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় স্কোর ৪৫ হলেও বাংলাদেশ সেখানে ২১ পয়েন্ট কম অর্জন করেছে। এমনকি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার দেশগুলোর গড় স্কোরের তুলনায় বাংলাদেশ পাঁচ পয়েন্ট এবং ‘বন্ধ সিভিক স্পেস’ থাকা দেশগুলোর গড়ের চেয়ে ছয় পয়েন্ট নিচে অবস্থান করছে।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীন ও কার্যকর করার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের প্রতিশ্রুতিও এখনও পূরণ করা হয়নি। বরং দুদকের অকার্যকরতা ও জবাবদিহীনতা বজায় রাখার মতো অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, লাওস ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থা জোরদার ও কঠোর বিচারিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি দেখাতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ সে ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা চলতি বছরে বাংলাদেশের চেয়ে তিন পয়েন্ট বেশি স্কোর অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাংলাদেশেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
এ সময় তিনি পরবর্তী সরকারের প্রতি আহবান জানান দুদককে স্বাধীন করা, সম্পদ বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, অর্থ পাচার রোধে আইন সংস্কার, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যম ও সিভিক স্পেসের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসনের ভিত্তি মজবুত করতে হবে।