আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘদিনের আলোচনা ও অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের পর আসন বণ্টনে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোট। জোটের শরিকদের মধ্যে মোট ২৯৪টি আসনে সমঝোতা হয়েছে। এর বাইরে ৬টি আসন উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
জোট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি রাতে ২৫৩টি আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়। সে সময় ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ২৫৯টি আসনে হাতপাখা প্রতীকে প্রার্থী দেওয়ায় পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়।
এর ফলে ইসলামী আন্দোলনের জন্য ফাঁকা রাখা ৪৭টি আসনের মধ্যে আরও ৩৬টি আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এতে করে জামায়াতে ইসলামী মোট ২১৫টি আসনে নির্বাচন করবে। জোটের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনও পেয়েছে দলটি।
ফাঁকা রাখা বাকি আসনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি আরও একটি আসন পেয়েছে, ফলে দলটির মোট আসন দাঁড়িয়েছে তিনটিতে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আগের সমঝোতার ২০টির সঙ্গে নতুন করে আরও ৩টি আসন পেয়েছে। এ ছাড়া দলটি আরও ছয়টি আসনে উন্মুক্ত নির্বাচনে অংশ নেবে, যেখানে জোটের শরিক দলের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
সমঝোতা অনুযায়ী খেলাফত মজলিস মোট ২৩টি আসনে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ২৯টি আসন। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি এবং বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টি পেয়েছে ২টি আসন।
তবে শেষ পর্যন্ত জোটের আসন বণ্টনে জায়গা পায়নি জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। আসন না পেলেও দল দুটি জোটের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে কাজ করবে বলে জানা গেছে।
জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩০০ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ২১৫টি আসন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে যাচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি ইতোমধ্যে মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে।
এনসিপির তথ্য অনুযায়ী, উন্মুক্ত থাকা মৌলভীবাজার-৪ আসনে দলটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। বাকি ২৯টি আসনে জোটের একক প্রার্থী হিসেবে এনসিপির প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন।
আসনগুলো হলো : পঞ্চগড়-১ (পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া, আটোয়ারী), দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী উপজেলা), রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলা), কুড়িগ্রাম-২ (কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলা), নাটোর-৩ (সিংড়া উপজেলা), সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর উপজেলা), পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া উপজেলা), টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল উপজেলা), ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা উপজেলা), মুন্সিগঞ্জ-২ (লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা), ঢাকা-৮ (মতিঝিল, রমনা, শাহবাগ, পল্টন ও শাহজাহানপুর থানা), ঢাকা-৯ (খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানা), ঢাকা-১১ (বাড্ডা, ভাটারা ও রামপুরা থানা), ঢাকা-১৮ (উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, তুরাগ ও খিলক্ষেত থানা), ঢাকা-১৯ (সাভার), ঢাকা-২০ (ধামরাই), গাজীপুর-২ (সিটি কর্পোরেশনের একাংশ, সেনানিবাস), নরসিংদী-২ (পলাশ উপজেলা ও সদরের আংশিক), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা), কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার উপজেলা), নোয়াখালী-২ (সেনবাগ উপজেলা ও সোনাইমুড়ী উপজেলার আংশিক), নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া উপজেলা), লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ উপজেলা), চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনের চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ এলাকা), বান্দরবান (বান্দরবান পার্বত্য জেলা) এস এম সুজা উদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও বিজয়নগর উপজেলা), নেত্রকোণা ২ (সদর-বারহাট্টা) ফাহিম পাঠান, মৌলভীবাজার ৪ (উন্মুক্ত আসন), রাজবাড়ি-২ (পাংশা-বালিয়াকান্দি-কালুখালী)।
তবে এনসিপি নারায়ণগঞ্জ-৪ (সদর উপজেলার আংশিক) আসনে জোট প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করলেও সেখানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী থাকবে বলে জানা গেছে।
২৯ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
জোট সঙ্গী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৯টি সংসদীয় আসনে রিকশা প্রতীকের চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেছে। যদিও জোটের সমঝোতায় দলটি পেয়েছে ২৩টি আসন। দলটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দলটির প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সমন্বয়ক হাসান জুনাইদ জানান, দশ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যর সমঝোতার আলাপের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিকশা প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোট ২৯ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। এর মধ্যে ২৩টি সংসদীয় আসনে “দশ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য”-এর আওতায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
অপর ৬টি আসনের মধ্যে সুনামগঞ্জ–৩ ও কিশোরগঞ্জ–১ আসনে খেলাফত মজলিস, মৌলভীবাজার–৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপি, ফেনী–২ আসনে এবি পার্টি এবং ফরিদপুর–৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে উন্মুক্ত ভিত্তিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা রিকশা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন।
দীর্ঘ আলোচনার পর জোটের আসন বণ্টন কাঠামোর সঙ্গে একমত হতে না পেরে আলাদা পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি ইতোমধ্যে স্বতন্ত্রভাবে ২৫৯ আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে।
দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, রাজনীতির নানা সমীকরণ ও আদর্শের বহুমাত্রিক বোঝাপড়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৯ আসনে একক নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাকি আসনের ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত হলো, ফ্যাসিবাদ বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে আসনভিত্তিক সৎ, যোগ্য ও জনতার প্রতি দায়বদ্ধ প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে। এরইমধ্যে মামুনুল হকের আসনে সমর্থন ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রচারণা শুরু হলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে হাতপাখা যেসব আসনে থাকবে না, সেই আসনগুলোর সমর্থন ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের নির্বাচনী আসনে (বরিশাল-৬) কোনো প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে পারস্পরিক সৌজন্য ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের দৃষ্টান্ত হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিমের নির্বাচনী (বরিশাল-৬) আসনে কোনো প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী জোট। ইসলামী আন্দোলনের ঐক্য গঠনে ভূমিকার প্রতি সম্মান জানিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, নির্বাচনে সরকারবিরোধী ভোট যাতে বিভক্ত না হয়, সেজন্যই এই আসন সমঝোতা অপরিহার্য ছিল। তারা আশা করছেন, সমঝোতার ফলে মাঠে জোটের প্রার্থীরা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।