গত এক দশকে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—জনগণের ভোটাধিকার হরণে পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে ‘জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন’। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে নির্বাচনগুলো প্রভাবিত করা হয়।
সরকার গঠিত পাঁচ সদস্যের এই তদন্ত কমিশন সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনটি নির্বাচনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি নির্বাচন কারচুপির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যুক্ত ছিলেন।
প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর জেলা শাখাগুলোকে ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার গায়েবি মামলার তালিকা প্রস্তুত করা হয় এনএসআইয়ের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে।
এই মামলাগুলোর মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, হয়রানি এবং অনেক ক্ষেত্রে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়, যাতে নির্বাচনী মাঠ কার্যত ফাঁকা থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগের রাতেই ব্যালট সিলের অভিযোগ
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তা ছিল। অনেক কেন্দ্রে ভোটারদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় এবং কৃত্রিম লাইন তৈরি করে ভোটগ্রহণ স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
২০১৪: প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন
২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কমিশন ‘একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ওই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে সংসদ সদস্যরা বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। হুমকি, চাপ এবং মনোনয়নপত্রে তথাকথিত ত্রুটির অজুহাতে অধিকাংশ আসনে একক প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। সরকার গঠনের জন্য ১৫১টি আসনকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
২০১৮: বহুল আলোচিত ‘রাতের ভোট’
২০১৪ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হওয়ায় ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর কৌশল নেওয়া হয়। তবে তদন্তে উঠে আসে, ওই নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে আগের রাতেই ভোট দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে বলে দেখানো হয় এবং ৭ হাজার ৯০২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ দেখানো হয় ৯০ শতাংশের বেশি। এ নির্বাচনের জন্য এনএসআই হেডকোয়ার্টার্সে ‘স্পেশাল সেল’ নামে একটি ইলেকশন সেল গঠন করা হয়, যেখান থেকে পুরো নির্বাচন মনিটরিং করা হয়। নির্বাচন শেষে ওই সেলের কন্ট্রোলরুমের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
২০২৪: ‘ডামি নির্বাচন’
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তদন্ত কমিশন ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করায় অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ দেখাতে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের দিয়ে তথাকথিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করা হয়।
ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম। তবে বিভিন্ন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা প্রিসাইডিং অফিসারদের সহায়তায় ব্যালটে সিল মারেন বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
সীমানা নির্ধারণ ও দল নিবন্ধনে কারসাজি
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দিতে সংসদীয় আসনের সীমানা পরিকল্পিতভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৩৩টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করে বিরোধী সমর্থিত এলাকাগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও আইন ও বিধিমালার বাইরে গিয়ে উদ্দেশ্যমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
নির্বাচন আইন পরিবর্তনের অভিযোগ
তদন্ত কমিশনের মতে, একদলীয় শাসনব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, ইভিএম চালু এবং নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিরোধী দল ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করে।
অনিয়মের প্রতীক গাইবান্ধা উপনির্বাচন
গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনকে অনিয়মের প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। সিসিটিভির মাধ্যমে ভোট পর্যবেক্ষণকে লোক দেখানো উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, ব্যাপক অনিয়মের কারণে শেষ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে বাধ্য হয় নির্বাচন কমিশন।
সুপারিশ
প্রতিবেদনের উপসংহারে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে সব ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।