সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘সুপারসনিক গতিতে’ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার তার ১৮ মাসের মেয়াদে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ৮৮টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, যা সংসদীয় আইন প্রণয়নের গড় হারের তুলনায় ১৩২ শতাংশ বেশি। প্রায় দুই দশক আগে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন জরুরি অবস্থার সরকারের রেকর্ডকেও এটি ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারের শেষদিকে বিশেষ করে শেষ দেড় মাসে আইন প্রণয়নের গতি ‘সুপারসনিক’ মাত্রাকেও ছাড়িয়ে মাত্র ৪৭ দিনে ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিলে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে অন্তত একটি করে মোট ৮০টি অধ্যাদেশ জারির নজির তৈরি হয়।
অধ্যাদেশের মাধ্যমে একদিকে নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বিদ্যমান বহু আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ি ভাষণে মুহাম্মদ ইউনূস তার সরকারের ‘আইন প্রণয়নে সুপারসনিক গতির’ কৃতিত্বের কথা উল্লেখ করে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছিলেন, এটি ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার মূলে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের’ অংশ।
সরকারি সংস্কার উদ্যোগের দিক তুলে ধরে ইউনূস বলেন, তার অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে [যদিও আইন মন্ত্রণালয়ের নোটে এ সংখ্যা ১৩৩টি উল্লেখ করা হয়েছে] এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব নির্বাহী আদেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। ড. ইউনূস বলেন, ‘এ সংস্কারগুলো নাগরিক অধিকার সুসংহত করেছে, বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করেছে এবং গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি যাতে আর ফিরে না আসে তা নিশ্চিত করেছে।’ তবে তার সরকারের আইন প্রণয়নের রেকর্ড ততটা উজ্জ্বল নয়। অভিযোগ উঠেছে, এসব আইন জাতীয় ও জনগণের স্বার্থবিরোধী কারণ একাধিক অধ্যাদেশের বৈধতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশই উপস্থাপন করতে হবে। এখন পর্যন্ত এসব অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ নেই। তবে প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত হওয়ার পর এগুলোর কার্যকারিতা থাকবে মাত্র ৩০ দিন। অধ্যাদেশের মাধ্যমে আগেই বাতিল করা না হলে, ৩০ দিন পূর্তির সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যাবে। সংসদ কোনো অধ্যাদেশ অনুসমর্থন করতে পারে না; তবে ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে যেকোনো অধ্যাদেশ বাতিল বা অননুমোদন করতে পারে। ফলে অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে।
আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশের বিধানসংবলিত সমসংখ্যক বিল পাস করে ১৩৩টি আইন বহাল রাখা সংসদের জন্য নিঃসন্দেহে দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সিনিয়র আইনজীবী শাহ্দীন মালিক বলেছেন, অল্প সময়ে এত অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে; সেক্ষেত্রে প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য গড়ে পাঁচ দিনের কম সময় লেগেছে। সংসদ বসা থেকে ৩০ দিনের মধ্যে যে অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি দেওয়া সম্ভব হবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মৃত’ বা বাতিল হয়ে যাবে। বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো তারা যাচাইবাছাই করছে।
১৩৩টির মধ্যে কতটি বা কোন অধ্যাদেশগুলোর তারাআইনি ভিত্তি দেবে সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা বিভিন্ন অধ্যাদেশের মধ্যে একটি বিতর্কিত এবং সর্বনাশা অধ্যাদেশ হলো ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৬’। অধ্যাদেশটি গত ১৯ জানুয়ারি তড়িঘড়ি করে জারি করা হয়। নির্বাচনের ঠিক আগে কেন এরকম একটি বিতর্কিত আইন প্রণয়ন করার প্রয়োজন হলো, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা যায়, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এ কালো আইন প্রণয়ন করেছেন। কৃষকবিরোধী, পরিকল্পনা ও উন্নয়নবিনাশী আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অধ্যাদেশটি একটির মতো এরকম প্রচুর গণবিরোধী, অগণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে গত ১৮ মাসে। যেসব অধ্যাদেশ জারির মূল হোতা ছিলেন আসিফ নজরুল এবং রিজওয়ানা হাসান।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতীয় সংসদের প্রতিটি অধ্যাদেশের যৌক্তিকতা যাচাই করে কোনটা দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে তা বিবেচনা করে যেসব অধ্যাদেশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও জনস্বার্থবিরোধী, সেগুলোকে আমলে না নিলে জাতীয় সংসদ গণবিরোধী অধ্যাদেশগুলো এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে। ফলে জনগণ কালো আইনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবে।